বাংলা পয়গাম https://poygambd.blogspot.com/2022/03/blog-post_5.html

কোরআনের সংরক্ষণ ও সংকলন

 কোরআন যেমন প্রিয়নবীর একটি জীবন্ত মোজেযা, তেমনি এর সংরক্ষণ ও সংকলনের গোটা প্রক্রিয়াটাও তাঁর একটি বড়ো মোজেযা।কোরআন সংরক্ষণের এই বিশেষ মোজেযা না থাকলে কোরআনের অবস্থাও আজ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মতো হয়ে যেতো। 

কোরআনের সংরক্ষণ ও সংকলন

       

কোরআনের সংরক্ষণ ও সংকলন

কোরআনের সংরক্ষণ ও সংকলন তখন থেকে শুরু হয় যখন থেকে কোরআন নাযিল শুরু হয়। তখন থেকেই আল্লাহর রসূল তা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য পারদর্শী সাহাবীদের নিযুক্ত করতে আরম্ভ করেন। হযরত যায়দ বিন সাবেত (রা.) ছাড়া আরো ৪২ জন সাহাবী এ কাজে নিযুক্ত ছিলেন। কোরআন যেমন প্রিয়নবীর একটি জীবন্ত মোজেযা, তেমনি এর সংরক্ষণ ও সংকলনের গোটা প্রক্রিয়াটাও তাঁর একটি বড়ো মোজেযা।
কোরআন সংরক্ষণের এই বিশেষ মোজেযা না থাকলে কোরআনের অবস্থাও আজ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মতো হয়ে যেতো। সীরাত গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কোরআনের কোনো আয়াত নাযিল হলে সাথে সাথেই আল্লাহর নবী কোনো একজন ওহী লেখককে দিয়ে তা লিখিয়ে নিতেন। এমন কখনো হয়নি যে, কোরআনের কোনো আয়াত নাযিল হলো- অথচ আল্লাহর নবীর সামনে কোনো ওহী লেখক মজুদ নেই। এ কারণেই প্রিয় নবী যখন মক্কা থেকে মদীনার দিকে হিজরত করছিলেন, তখন সে কঠিন সফরেও তাঁর সফরসাথী হযরত আবু বকর (রা.) কিন্তু কাগজ কলম সাথে রাখতে ভুলেননি। এই সময়ে আরবে কাগজের অস্তিত্ব ছিলো। আরবীতে কাগজকে বলা হয় ‘কেরতাছ'। কোরআনে সূরা আল আনয়ামের ৭নং আয়াতে এর উল্লেখ রয়েছে।


 মক্কায় যখন কোরআন নাযিল হয়, তখন অনেক লোকই সেখানে পড়ালেখা জানতেন। বলা হয়, সে সময় মক্কা ও তার আশেপাশের হাজার হাজার বাসিন্দাদের মাঝে কমপক্ষে শ'খানেক লোক ভালো করে পড়তে ও লিখতে পারতেন। আল্লাহর নবী এদের মাঝ থেকেই ওহী লেখক মনোনীত করেছিলেন। একদিকে এরা ওহী লিখতে শুরু করেন, অপরদিকে সাহাবীরা ওহীর এ বাণীগুলো মুখস্ত করতে থাকেন। কোরআন সংরক্ষণের জন্যে আল্লাহ তায়ালা একই সময়ে এ দুটি পদ্ধতিই অবলম্বন করে রেখেছিলেন। তখনকার দিনে মানুষদের স্মৃতিশক্তি এতো প্রখর ছিলো যে, তারা শত শত লাইনের কবিতা ও বংশানুক্রমে তাদের পূর্বপুরুষদের নাম ধাম মুখস্ত বলে দিতে পারতো। 

 

প্রিয় নবীর ইন্তেকালের কিছু আগেই কোরআনের নাযিল প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে আল্লাহর হুকুমে জিবরাঈল (আ.) প্রিয় নবীর কাছে এসে কোরআনের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতা ঠিক করে দিয়ে গেলেন- ঠিক যেভাবে আজ আমাদের কাছে কোরআন মজুদ আছে- ঠিক সেভাবে। এভাবেই ৬৩২ সালে প্রিয় নবীর ইন্তেকালের সময় সমগ্র কোরআনও আল্লাহর ওয়াদামতো সংকলিত হয়ে গেলো; যদিও তখনো তা গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়নি। 


এই মহান কাজটিই আঞ্জাম দিয়েছেন মুসলিম ইতিহাসের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)। প্রধান ওহী লেখক হযরত যায়দ ইবনে সাবেত আনসারী (রা.)-কে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিলেন। খলীফার আদেশ পেয়ে হযরত ওমর (রা.) ও হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.) ঘোষণা জারী করে সবাইকে অনুরোধ করলেন, যার কাছে কোরআনের যে অংশ লিখিত অবস্থায় আছে, তিনি যেন তা অবিলম্বেই হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.)-এর কাছে জমা দেন। অল্প দিনের মধ্যেই দেখা গেলো, সাহাবায়ে কেরামদের যার কাছে কোরআনের যা কিছু লেখা ছিলো তা এক জায়গায় এসে জমা হয়ে গেলো। এরপর শুরু হলো এগুলোর কঠোর যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া। ইতিমধ্যেযেহেতু সমগ্র মুসলিম জনপদে হাজার হাজার কোরআনের হাফেয তৈরী হয়ে গেছে, তাই এদের স্মৃতির নাথে মিলিয়ে হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.) কোরআনের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মায়াতকে যাচাই বাছাই করার সুযোগ পেলেন।


 খলীফার মনোনীত কমিটির পক্ষ থেকে সাহাবীদের কাছ থেকে কোরআনের লিখিত অংশের গ্রহণযোগ্যতার জন্যে কমপক্ষে দুই জন বিশ্বস্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হলো। এখানে সূরা তাওবার শেষ দু'টো আয়াত শুধু হযরত আবু খোষায়মা ইবনে সাবেত (রা.)-এর কাছেই লিখিত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলো। হযরত আবু খোযায়মা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত কোরআনের এ দুটি আয়াতের ব্যাপারে হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, এ দুটি আয়াতও তোমরা লিখে নাও। কারণ রসূলুল্লাহ তাঁর জীবদ্দশায় আবু খোযায়মা (রা.)-এর সাক্ষ্যকে সব সময়ই দুই জন সাক্ষীর সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। স্বয়ং খলীফার সূত্রে আল্লাহর নবীর এ হাদীস পাওয়ার পর হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.) এ দুটো আয়াত গ্রহণ করেন। এভাবেই শত শত হাফেযদের স্মৃতির সাথে যাচাই বাছাই করে প্রিয়নবীর লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামদের ঐকমত্যে কোরআনের আয়াতগুলো একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে গেলো।

 

 লিপিবদ্ধ হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা.) সবাইকে এর একটা নাম খুঁজে বের করার জন্যে বললেন। পরে সকলের মতামতের ভিত্তিতে এর নামকরণ করা হলো- আল মোসহাফ'। আল মোসহাফের কপি | হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.) রসূলের খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর হাতে তুলে দিলেন। তার মৃত্যু পর্যন্ত এটি তার কাছেই সংরক্ষিত থাকে। তার মৃত্যুর পর এটা চলে যায় দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর কাছে। হযরত ওমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর এই 'মোসহাফ' নবীপত্নী হযরত ওমর (রা.)-এর কন্যা হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। হযরত ওমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর হযরত ওসমান (রা.) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন মুসলিম সাম্রাজ্য পূর্বপশ্চিমের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাহাবায়ে কেরামরাও দেশে দেশে কোরআনের বাণী ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন।

  

তাদের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক পঠনরীতির পার্থক্যের কারণে কোরআন পাঠ নিয়ে কিছু কলহ বিবাদ শুরু হয়। বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণ পদ্ধতির বিভিন্নতার কারণে একই অক্ষর একই শব্দ নানাভাবে পঠিত হচ্ছিলো। এই সময় ভবিষ্যতের নানা আশঙ্কার কথা চিন্তা করে তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা.) মর্যাদাবান সাহাবাদের পরামর্শের ভিত্তিতে এটা স্থীর করলেন, একক উচ্চারণের পাঠরীতির ভিত্তিতে একটা ‘মোসহাফ' সংকলন করা হবে। নবীপত্নী হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছে রক্ষিত ‘মোসহাফ'-টি এনে চারজন বিশিষ্ট সাহাবীর তত্ত্বাবধানে সবার মতামতের ভিত্তিতে হযরত সাঈদ ইবনে আল আস (রা.)-এর উচ্চারণ রীতি ও হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা.)-এর লেখনীতে কোরআনের একটি একক সংকলন তৈরী হয়ে গেলো। পরে এর ৭টি | প্রতিলিপি মক্কা, সিরিয়া, ইরান, বাহরাইন, বসরা ও কুফায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। অতপর এই ৭টি দেশে পাঠানো কোরআনের মূল কপির প্রতিলিপি হিসেবে দেশে দেশে আরো অসংখ্য কোরআনের কপি তৈরী হলো।


 অষ্টাদশ শতকে প্রিন্টিং মেশিনের আবিষ্কার পর্যন্ত হাতে লেখা কোরআনের প্রতিলিপি বানানোর এই ধারা অব্যাহত থাকলো। ধাপে ধাপে প্রিন্টিং মেশিনের উন্নতির সাথে সাথে আরো অধিক ও উন্নত পরিসরে ব্যাপকভাবে কোরআনের ছাপার কাজ চলতে থাকলো। ধীরে ধীরে আমাদের এই গোলার্ধ্বের সর্বত্র- মাসজিদ মকতব, লাইব্রেরী স্কুল, মাদরাসা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পার করে কোরআনও ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলো। এভাবে আল্লাহ তায়ালা লক্ষ লক্ষ হাফেযদের দিয়ে কোরআনের প্রতিটি অক্ষর মুখস্ত করার মাধ্যমে কোরআন সংরক্ষণে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করে নিলেন। কোরআনের এই বিস্ময়কর সংরক্ষণ ও সংকলন প্রক্রিয়ার সাথে আরবী ভাষাকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করাটাও কোরআনের মতোই জরুরী ছিলো। আরবী ভাষায় কোরআন নাযিল হওয়ার কারণেকোরআনকে যেমন আরবী থেকে আলাদা করা যায় না- তেমনি আরবীকেও কোরআন ছাড়া কল্পনা করা যায় না। অন্যান্য ভাষার মতো আরবীও যদি এই দেড় হাজার বছরে বদলে যেতো, তাহলে জানি না- দুনিয়ার মানুষরা কোরআন পড়তো কিভাবে? কোরআনের সংরক্ষণটাই বা কিভাবে সম্ভবপর হতো? আমাদের চোখের সামনে কি পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাগুলোর জীবন্ত উদাহরণ নেই? ৫০০ বছর আগের ইংরেজী ও বাংলাকে বুঝার জন্যে এখন গবেষকদের প্রাচীন  অভিধানগ্রন্থ কিংবা অনুবাদের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। আর মূল ভাষায় ব্যাপক বিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের কথাগুলো এতো বদলে গেছে যে, যে ভাষায় এ ধর্মগ্রন্থগুলো নাযিল হয়েছে- কিংবা প্রথমদিকে যে ভাষায় এগুলো লেখা হয়েছে সে অরিজিন্যাল ভার্সন এখন শুধু যাদুঘর কিংবা সে ভাষার আর্কাইভেই পাওয়া সম্ভব। কোরআন নাযিলের সময় ভাষা  হিসেবে আরবী খুব সমৃদ্ধ থাকলেও তার স্বতন্ত্র ভাষাশিল্প তখনও প্রণীত হয়নি ।

 

 প্রিয় নবীর তিরোধানের পর পারদর্শী সাহাবায়ে কেরাম ও হিজরী ১ম শতকের ভাষাবিদরা যে পরিশ্রম করে আরবীর জন্যে স্বতন্ত্র ভাষাশাস্ত্র তৈরী করেছেন তার তুলনা সত্যিই বিরল। খেলাফতে রাশেদার শেষের দিকে ও উমাইয়া খেলাফতের প্রথমদিকে ভাষাবিদরা আরবী ভাষায় ছরফ, নাহু, লোগাত, ফাসাহাত, বালাগাত ইত্যাদির জন্যে নতুন নিয়মনীতি বানিয়েছেন। তারা নোকতা ও হারাকাত প্রবর্তন করেন, যদিও এগুলো তারা করেছেন সম্পূর্ণ কোরআনের ভাষা ও ভাষাশৈলীর সংরক্ষণের স্বার্থে, কিন্তু পরে তা-ই বৃহত্তর পরিসরে আরবী ভাষাকে স্থায়ীভাবে হাজার বছরের নানা বিবর্তনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার রক্ষা করচে পরিণত হয়ে গেলো। আল্লাহ তায়ালা যখন কোরআনকে হেফাযত করার ওয়াদা করেছেন তখন কোরআনের ভাষা- আরবীর হেফাযতও আল্লাহ তায়ালার এই ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো। আজ পশ্চিম আফ্রিকার একজন আরব বেদুঈন যে আরবী ভাষায় কথা বলে- জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বসে অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিও সে ভাষায়ই কথা বলে, অবিকল সে আরবী- যে আরবীতে দেড় হাজার বছর আগে কোরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার ওয়াদার কারণে কোরআন নাযিলের দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই ভাষার সামান্য একটা শব্দ ও তার শাব্দিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সেদিন যে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হতো, আজ দেড় হাজার বছরের এ দুস্তর ব্যবধানেও সেই শব্দটি ঠিক সেই অর্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা কোরআনের আরেকটি বড়ো রকমের মোজেযা এবং এভাবে কোরআনের সাথে কোরআনের ভাষাও এই ইউনিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার অংশে পরিণত হয়ে গেলো। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা অনুযায়ী কোরআন কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে গেলো।


অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

MD.julker nine
পোস্ট করেছেনঃ MD.julker nine
পোস্ট ক্যাটাগরিঃ
0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

 عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : " كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَبْعَةً ، لَيْسَ بِالطَّوِيلِ وَلا بِالْ...

টেক জান প্রো কী?